ইউরোপীয় উচ্চ শুল্ক ও নানা বাণিজ্যিক বাধার মুখে সম্প্রতি সম্প্রসারণ পরিকল্পনা নতুনভাবে সাজাচ্ছে চীনা বিদ্যুচ্চালিত গাড়ি (ইভি) নির্মাতারা। গত বছর ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) চীনা ইভির ওপর সর্বোচ্চ ৪৫ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপ করে। তাদের যুক্তি ছিল, চীন সরকার ইভি শিল্পে অন্যায্যভাবে ভর্তুকি দিচ্ছে। এখন শুল্ক আরোপের কারণে ইউরোপে দাম সক্ষমতায় চীনা ইভি প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান হারিয়ে ফেলে। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের বাজারও দেশটির ইভির জন্য কার্যত বন্ধ। খবর এফটি।
গত সপ্তাহে অনুষ্ঠিত সাংহাই অটো শোতে চীনভিত্তিক গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান নিওর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) উইলিয়াম লি স্বীকার করে নেন, কোম্পনির প্রাথমিক পরিকল্পনায় এসব সমস্যা কম গুরুত্ব পেয়েছিল। তবে ইভি কোম্পানিগুলো ইউরোপে ধীরে ধীরে নিজেদের উপস্থিতি বাড়ানোর ব্যাপারে ‘দৃঢ় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ’।
গাড়ি শিল্প বিশ্লেষক ম্যাথিয়াস শ্মিথ বলেছেন, ‘উচ্চাকাঙ্ক্ষা থাকলেও ইউরোপ ও যুক্তরাজ্যে চীনা গাড়ি ব্র্যান্ডের বাজার এখনো সীমিত। চলতি বছরের প্রথম দুই মাসে তাদের বাজার হিস্যা ছিল মাত্র ৪ দশমিক ৩ শতাংশ।’
গত মাসে চীনা কোম্পানি লিপ মোটরের সিইও ঝু জিয়াংমিং বলেন, ‘৩০ দশমিক ৭ শতাংশ শুল্ক ও ১০ শতাংশ পরিবহন খরচ একসঙ্গে আমাদের ইউরোপে প্রতিযোগিতার সক্ষমতাকে গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।’
গত বছর নেদারল্যান্ডসভিত্তিক গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান স্টেলান্টিস চীনা কোম্পানি লিপ মোটরের ২০ শতাংশ শেয়ার কিনে নেয়। চুক্তি অনুযায়ী, ইউরোপের ফিয়াট ও পিউজো শোরুমে লিপ মোটরের ইভি বিক্রির পরিকল্পনা ছিল। তবে গত মার্চে স্টেলান্টিস হঠাৎ পোল্যান্ডে লিপ মোটরের ছোট মডেল টি০৩-এর উৎপাদন বন্ধ করে দেয়। এ সিদ্ধান্তের কোনো কারণ জানানো হয়নি।
ইইউর ট্যারিফ সিদ্ধান্তের পক্ষে ভোট দেয়া দেশগুলোর একটি হচ্ছে পোল্যান্ড। বর্তমানে লিপ মোটরের প্রধান অগ্রাধিকার হচ্ছে ২০২৬ সালের দ্বিতীয় বা তৃতীয় প্রান্তিকের মধ্যে ইউরোপে নিজস্ব উৎপাদন কার্যক্রম শুরু করা।
ম্যাথিয়াস শ্মিথ আরো বলেন, ‘ভর্তুকিবিরোধী শুল্ক চীনা ইভির বাজার প্রবেশের গতি কার্যত থামিয়ে দিয়েছে।’
এক্সপেং ও বিওয়াইডির মতো চীনা কোম্পানিগুলো নতুন মডেল নিয়ে ইউরোপে প্রবেশের চেষ্টা করছে। শুল্ক আরোপের আগে সেখানকার ইভির বাজারে তাদের হিস্যা ছিল ৫০ শতাংশ, এখন তা কমে দাঁড়িয়েছে ৩০ শতাংশে। অনেক প্রতিষ্ঠান বর্তমানে পেট্রলচালিত গাড়ির দিকে ঝুঁকছে, যেগুলোর ওপর নতুন শুল্ক প্রযোজ্য নয়।
নিও চলতি বছরের শেষ নাগাদ ইউরোপের পাঁচটির বেশি দেশে ফায়ারফ্লাই নামের সাব-ব্র্যান্ডের অধীনে ছোট আকারের ইভি বাজারে আনতে চায়। তবে চীনে মডেলটি চালুর সঙ্গে ইউরোপের বাজারে উদ্বোধনের সমন্বয় ঘটাতে ব্যর্থ হয়েছে।
ইউরোপে ডিলারশিপ নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণে ভোগান্তিতে পড়েছে নিও। কোম্পানির সিইও বলেন, ‘চীনে এক মাসে ১০০টি শোরুম খোলা সম্ভব হলেও ইউরোপে তা অনেক কঠিন। খরচ আমাদের প্রত্যাশার তুলনায় অনেক বেশি।’
এদিকে বিওয়াইডির ম্যানেজমেন্ট আর্থিক সেবা প্রতিষ্ঠান সিটির বিশ্লেষকদের জানিয়েছে, কোম্পানিটি আশা করছে যে চলতি বছর তাদের মোট রফতানির ২০ শতাংশ আসবে ইউরোপ থেকে, যেখানে গত বছর তা ছিল ১৫ শতাংশ। বিওয়াইডি শিগগিরই হাঙ্গেরিতে উৎপাদন শুরু করতে যাচ্ছে।
চীন বর্তমানে ইইউর সঙ্গে উচ্চ পর্যায়ের আলোচনার মাধ্যমে শুল্ক সমস্যার সমাধানে কাজ করছে। সাংহাই অটো শোতে মার্সিডিজ বেঞ্জের সিইও ওলা ক্যালেনিয়াস বলেন, ‘আমরা যেকোনো দেশের, যেকোনো দিক থেকে প্রতিযোগিতার জন্য উন্মুক্ত, তবে সেটা সমান শর্তে হতে হবে।’
তিনি আশা করছেন যে উভয় পক্ষ একটি ‘ন্যায্য ও বাস্তবসম্মত সমাধানে’ পৌঁছবে।